মনোনেশ দাস : মুজাটি গ্রামের বাসিন্দা। মুজাটিসহ আশেপাশের গ্রাম শ্রীপুর, আধপাখিয়া, চরপাড়া, মধ্যপাড়া, আলগীরচর, মানকোনেসহ (পৌরসভা ও মানকোন ইউনিয়নে) বিভিন্ন স্থানে আমাদের বংশ পরম্পরায় একশ ত্রিশ একরেরও বেশি জমিজমা ছিল । চাষাবাদ ও বাগান এবং ভিটায় চার চোয়ারি অনেক গুলো ঘর ছিল। দাদা চাকুরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন । কর্তা, জেঠী মা, মা উনারা বরগাদারদের দিয়ে চাষাবাদ করাতেন । বাড়িতে কায় কামলারা খেয়ে যেতেন । যাকে বলে, ভাতের বিনিময়ে কামলা । কামলাদের খাওয়ানোর জন্য ৪টি বড় বড় ডেগ ছিল ।
আলগীর চর গ্রামের বাসিন্দা হাফিজার ভিক্ষাই সম্বল । পরম্পরায় তিনি আমাকে চেনেন । যৌবনে ৭০ আশির দশকে গতর ব্যবসা করতেন। এখন জৌলুষ হারিয়ে শারীরিক জটিলতা। অনেকে অভিশাপ দিয়ে বলে , যেআকাম করছস এটাই তর প্রাপ্তি । হাফিজার একমাত্র ছেলে যার রয়েছে ৩ মেয়ে ও ১ ছেলে সন্তান । বয়স কত জানে না হাফিজা। একমাত্র পুত্র রাজমিস্ত্রীর হেলপার সাত্তারের শরীরেও বাসা বেঁধেছে টিউমার । সপ্তাহে ১দিন কাজ করলে বাকী দিন বেকার থাকেন ।
মুক্তাগাছা প্রেসক্লাবের সামনে প্রায় প্রতিদিন ভিক্ষা করেন । আমি তাকে ভিক্ষা দেই । একদিন দাবি করে বলে ছুডু দাদা (প্রীতেশ দাস) কাইল্লার মাসহ অনেকের নামেই কার্ড কইরা দিছে । হুনি তুমি দাদা অনেক বড় সাংবাদিক । আমারে একটা কার্ড কইরা দেও । তোমার বাড়িতেই মানুষ আমাদের বাপ- দাদারা । আমার একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি ।
সত্তরের দশকে আমার জন্মের পর থেকে মায়ের বুকে দুধ ছিল না। আমাকে ছাগলের দুধ খাওয়ানো হতো । বক স্যার বাল্য শিক্ষা পড়িয়ে যেতেন । আমার পিঠাপিঠি ভাই প্রীতেশ দাস উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা । ছোটবেলায় কর্তা, নুরীর মা, রানুর মা, বিনা দি, লক্ষী দি , পিসি তৃপ্তী রাণী হোড় আমাকে লালন পালন করেছেন । আশপাশের জমি থাকার সুবাদে জমি নির্ভর কৃষকদের পরিবার পরিজন্মা কে মাথায় তুলে রাখতেন আমাদের । নিজের ভাই ভাইপো নাতী- নাতনী মনে করতেন ।
সত্তরের দশকে আমার বাবা বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পৈত্রিক ভিটায় ফিরে আসেন বাবা। চারপাশে মানুষের মুখে শুনতেন , তোর বড় ভাই পরেশ দাস ভাল মানুষ ছিলেন । পাঞ্জাবিরা তাকে গুলি করে মেরেছে । তোর মা সৌদামিনি দাসের চুল কেটে নিলো রাজাকাররা । পোড়া বাড়ির বাসিন্দা হয়ে গেলেন বাবা। । দাদা রমেশ দাস ছিলেন জমিদার আমলের নায়েব। একাত্তরে জেঠা পরেশ দাসকে হত্যা করার পর বর্গাদার ও সয় শরিকরা জমি জমা দখলে নেয় । বাবার অংশের জমিজমা অল্পটাকা নিয়ে দলিলে সই করে দেন।
বাবা ভিটাছাড়া জমি জমা তেমন একটি পাননি । কর্তার দুটি বালা নিয়ে রিকশার ব্যবসা শুরু করেন । উত্তরবঙ্গের একটি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তা বিশাদা’র বাবার সাথে সাইকেল পার্টস ব্যবসা করেন । মুক্তাগাছায় জনতা নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির মালিক আমরা । বড় মসজিদ রোড, দরিচার আনি বাজার, বড়হিস্যা বাজারে জনতা মার্কেট, জনতা সাইকেল মার্ট বাবা ভবেশ দাসের নামে প্রতিষ্ঠিত ।
প্রখ্যাত ডাক্তার নরেন্দ্র সাহা, নন্দ সাহার বাসার একটি অংশ কেনেন বাবা । আমি ক্লাস টুতে পড়ি তখন । মাড়োয়ারি পট্রির বাসিন্দা সীতারাম সুরেকা , টানবাজারের সুনিল পাল মাষ্টার , নৃপেন্দ্র চন্দ্র চন্দ ( বাঁশাটি ইউপি চেযারম্যান উজ¦লের বাবা) উনারা পরিবহনসহ ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিলেন ।
রিকশার ব্যবসার সূত্র ধরে মুক্তাগাছা শহরের মেইনরোড ঢলুয়া বিল, ময়মনসিংহ সদরের কাঠবওলা ও আকুয়া ভোটঘর এলাকাঢ জমি কিনে গ্যারেজ দেন । বাবার ইচ্ছা ছিল আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো । আমি হয়ে গেলাম সাংবাদিক । নব্বইয়ে শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজে একদশ ¤্রিেণতে ভর্তি হয়ে কেরাম , দাবা, তাস খেলায় কমনরুমে বেশি ব্যস্ত থেকেছি । মন চাইলে ক্লাস করতাম ।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সহপাঠী ও বাল্যবন্ধুরা মিলে ফেন্ডশিপ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করি । আমরা তখন ছাত্রদল করতাম । কলেজ ফিরে বাসায় এসে অনেক পত্রিকায় চিঠি লিখতাম ছদ্ম নামে। সংবাদপত্রের সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন বুনতে লাগলাম ।
লাগাম ছাড়া মোশারফ হোসেন সরকার সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হয় । তিনি আমাকে একটি স্থানীয় পত্রিকায় নিয়ে যান । কার্ড পেতে টাকা লাগবে শুনে দৈনিক জাহানে যোগাযোগ করি । দৈনিক জাহানের সম্পাদক প্রয়াত শেখ হাবিবুর রহমান আমাকে দিয়ে একটি নিউজ লেখান । সিউজ দেখে ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয় জেলার সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেন । চিঠি দিয়ে হবে না । সব সংবাদ ছাপে না চিঠিতে ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন